পশ্চিমবঙ্গের কবিতা

হীরক বন্দ্যোপাধ্যায় 
ক্রমশ গিলোটিন

ছুরির ফলা এগিয়ে আসছে
তিন দুই এক শূন্য...
বিস্ফোরণ, নিরীহ বুর্জোয়া শব্দটির পাশে
এখন আর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই
লড়াই মিছিলের মতো শুধু এক ধূসর পৃথিবী

একে একে ফিরে গেছে অক্ষৌহিনী সেনা
এখন কেউ তার কোনো হিসেবও রাখে না
বিমূঢ় বিক্ষোভে কান্নারত শৈশব
ঘন কুয়াশার ভিতর
ডুবে যাচ্ছে গাছের মর্মরধ্বনি
তুমি দেখেও দ্যাখো না

এখন আমাদের সবই নিয়ন্ত্রিত
সত্য উচ্চারণে সহস্র গিলোটিন নেমে আসে
তুমুল বৃষ্টিপাতের ঘটনা আজ আর মনে পড়ে না
নিঃশ্বাসের বায়ু, উদ্ধারের আঙুল
বৌদ্ধযুগের ভাঙামূর্তির মতো
দমিত, স্বাধীনতাহীন...
বিষয় হারানোর মতো একটি অশেষ ধন্যবাদ ছাড়া 
এখন আর আমাদের কোনো গত্যন্তর নেই...

রাহুল গুহ
জন্মদাগ - ১  

আমাকে তুমি অনেক দিয়েছ 

জটাধারী অশ্বথ গাছ— বুকভরা নদীগর্ভ মাতৃস্নেহ 
সাতমহলা বাড়ি—
সন্তান, ভালোবাসবার মতো নারী 
স্পর্শ করবার মতো প্রসারিত হাত 
নিঃশ্বাস নেবার মতো সবুজ বাতাস 

আকাশের ঘন নীল রঙ 
উদাসী বিকেলে ডুব দিয়ে খুঁজে পাওয়া কুমিরডাঙা—
হারানো আলপথ আর মোহনবাগান লেন মিলেমিশে 
আমাদের ছেঁড়াখোঁড়া পূর্ব কলকাতার সরকারি আবাসন 
মায়াবী আলো মেখে গোল্লাছুট সিলিকন ভ্যালি 

আমাকে তুমি অনেক দিয়েছ 
তাই তোমাকে দেবার জন্য খুঁজে এনেছি— এই দ্যাখো  
জন্মঘুনসি আর জড়িয়ে রাখা আঙুলের নির্ভরতা  

ঈশানী রায়চৌধুরী
দুটি কবিতা 

কাঁপছে ছায়া পূর্ণচাঁদের 
ঝিলিক তুলে বুকের ঝিলে
যেমন করে হৃদয় কাঁপে
ভালোবাসার অন্ত্যমিলে

‘আমার জ্বলেনি আলো...’
জোনাকিরা ডানা মুড়ে আছে, ভুলে গেছে কী কী কথা আর
ঝিমঝিম মলিন আঁধারে কথা ছিল পথ চেনাবার
মাঠ ঘাট নদী ও ঝিলেরা
কালচে সবুজ কাচঘর
রাত বাড়লেই কানামাছি
ভয়ের কান্না তারপর
অথচ খুব কী ছিল ক্ষতি?
যদি তুমি হাতটি বাড়াতে
অন্ধকারে
একক তপতী...

অদিতি চক্রবর্তী
যাবার কথা ছিল বুঝি! 

ভোরের শুকতারা, হঠাৎ নেমে আসে
আমার শৌখিন ড্রইঙে!
তার হাতে দি একপেয়ালা দার্জিলিং টি
তারপর, তারপর, কী তাড়নায় উঠে পড়ি
হেলানো সোফা ছেড়ে—
সন্দিগ্ধ তারার চোখে প্রশ্ন
“কোথাও যাবার কথা ছিল বুঝি?”
মাথা নাড়ি স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝামাঝি আমি!
তারপর বেঁধে নিই আমার ভাবনাগুলোকে,
সাজানো গোছানো পরিপাটি বাক্সে,
চেতনা, মনখারাপ, বিবেকগুলোকে,
ফেলে রাখি পুরোনো তোরঙ্গে,
সুখটাকে গুছিয়ে নিই আইভরি বাক্সে!
প্যাকিং শেষে ফিরি তড়িঘড়ি
কোথায় শুকতারা—
পড়ে আছে ফাঁকা পেয়ালা।
দীর্ঘ দুপুর নেমে আসে কার্নিশে কার্নিশে,
নিস্তব্ধতাকে দিয়ে আসি চিলেকোঠার সামনে
ভিড় করে আসা পায়রাগুলোকে,
সে প্রশ্ন করে, “কোথাও যাবার কথা ছিল বুঝি?”
মাথা নাড়ি স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝামাঝি আমি!
গুছিয়ে তুলে রাখি সারি সারি
কৈশোর থেকে যৌবনের স্মৃতি পরপর—
তারপর তুলে নিই সাথে কিছু গান
শুধু ওইটুকুই,
গোছাতে গোছাতে শেষ হয় বেলা—
শুকতারা ফিরে আসে সন্ধ্যাতারা হয়ে,
চৌমাথায় চায়ের দোকানে ওঠা ধোঁওয়া
অঘ্রাণের নরম কুয়াশা মেশা
কানে কানে বলে এসে
“কোথাও যাবার কথা ছিল বুঝি?”
মাথা নাড়ি স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝামাঝি আমি!
কিছুতেই পাই না ভেবে কোথায় যাবার ছিল কথা!
শুধু মাথার ভিতর ঘুরপাক করে,
সত্যিই ছিল বটে কথা 
“হেথা নয় অন্য কোথা অন্য কোনোখানে” 

শিবসাগর দেবনাথ

প্রশস্তি

ভুলে যাব, বিস্মৃতি এতই পরম?
এই মাটি, ঘাস, বাবুইয়ের বাসা, বাঙ্ময় কুঁড়ি— সব আছে;
তুমি আছ— সব ভালো 

তোমাকে ভোলেনি কেউ, 
তাই তো আকাশ গলে শিশির ঝরে পড়া... 

গাছ

এই যে এলোমেলো মন—
ভাবি, তোমার থেকে শেখা

শুভ্রা রায় দত্ত
হাইবারনেশন 

সরীসৃপের কাছে এইবার ঘুম ধার নিই—
শীতঘুম, তার বেশি চেয়ে নেব চোখের আড়াল
বাস্তুসাপ, রক্তে বাজে নিষিদ্ধ ময়ূর কিঙ্কিণী
নিরাকার ঘাসফুলে শুয়ে থাকি সমান্তরাল 

যার মুখে খাদ্য নেই, নববস্ত্র— কুয়াশার রাত
ঘিরে আছে, আগুনের হোমকুণ্ড থেকে কিছু দূরে
সমস্ত শরীরে তার শল্কপ্রিয় জলের সংঘাত
দ্বিধা মুছে, ঘুম চায়, শীত এলে দুই ঠোঁট জুড়ে

বহুকাল বুভুক্ষু, দুধকলা ফেলে আসা চোখ
দেখে, মাঠে পড়ে আছে বাসনার খোলসের রাশি 
বিষদাঁতে ক্ষুধা তবু আদেহ নতুন নির্মোক
যেমন তোমার ঠোঁটে খুদকুঁড়ো ভালোবাসাবাসি

সরীসৃপের কাছে ঘুম ধার নিই এই শীতে
নিরক্ত চুম্বনে ছুঁয়ে যাই কলাপের নীল
আগুন জ্বলেছে আর পুরানো সম্পর্কের ভিতে 
ছোবল মেরেছি শুধু, অকাতর বিষ বর্ণিল

এসব গল্পকথা, গত গ্রীষ্মের পাপ ভেঙে
এই জন্ম সরীসৃপ, আগামীর ক্ষুধার্ত প্রেমে

জিয়া হক
প্রথম মুনাজাত

আমাকে ক্ষমা করো ও প্রিয় আমার 
অজ্ঞাতসারে আমি অবাধ্য এক
কুয়োয় পড়েছি, তুমি জানো। 
জল ও অন্ধকার নিয়ে সে তো 
প্রস্তুত ছিল, 
         গ্রহণেরও অনেক অভিজ্ঞতা তার আছে 
আমি যে বেমালুম পড়ে গেলুম ও আমার প্রিয় 

খালি আলোর দিনগুলো, 
দিনের আলোদের কথা মনে পড়ে—
এটা শাস্তি, এটুকুই শান্তি এখানে 
উপর ও নিচ এই মনে পড়াটুকুতেই আটকে রয়েছে 
তুমি সবই জানো। 
আফিয়াত দাও, ওই দরজাখানি খুলে রেখো 
যেটা দিয়ে জান্নাত দেখা যায় আর তার বাতাস। 
পৃথিবীর জানালাদের আমি এ-কারণেই 
সমীহ করি, বর্ষাপর্বে ছাঁট ও ঝাপটা উপহার দেয়। 
দূরের নক্ষত্রে দুপুরের স্কুল ছুটির ঘণ্টা শুনব বলে 
কান পেতে থাকি। 
আমি কি ধরে নেব স্কুলখানি নেই? করণিক ভাতঘুমে 
গেছে? ছুটিগুলি মৌখিক ঘোষণা? 
মনোবিদ, নাক-কান-গলাবিদের কাছে যেতে হবে? 
আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করো, 
আমি পাতার লেফাফা ভেবে কুঁয়োয় পড়েছি, 
তুমি জানো সবিশেষ তাই আফিয়াত দাও 
সরু জল যেন কাদা করে না বসি 
        ইত্যবসরে 

সেখ সাহেবুল হক
দু-টাকা

ঠাকুমার আঁচলের গিঁট আর নেই।  
ভারতের মানচিত্র আঁকা
একটা পুরানো দু-টাকার কয়েনে শৈশব আগলে ছিলাম।
সেদিনের দশ পয়সার হজমি লজেন্স, কাচের গুলি...

‘সোনারপুর লোকালে’ ধুলোমাখা একটা ছেলে গাইছিল—
তার শূন্য হাতে দু-টাকাটা রেখে দিলাম।

কিছু দু-টাকা শৈশব শেষ করে দেয়। তবুও...


 

menu
menu